
সংগৃহীত ছবি
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কার্যত দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে। বন্যা, পাহাড়ধসের আশঙ্কা, সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। জেলাটিতে প্রবল স্রোতে ভেসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদিকে থানচির দুর্গম নাফাখুম ও আমিয়াখুম এলাকায় আটকে পড়া ৯০ জন পর্যটককে নিরাপদে উদ্ধার করে থানচি সদরে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অব্যাহত ভারী বর্ষণে থানচিতে সাঙ্গু নদীর পানি বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলা সদর থেকে তিন্দু ও রেমাক্রী ইউনিয়নের নৌযোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর ফলে নাফাখুম ও আমিয়াখুম এলাকায় পর্যটকেরা আটকা পড়েন।
মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে রেমাক্রী ও পদ্মমুখ হয়ে আটকে থাকা ৯০ জন পর্যটক নিরাপদে থানচি সদরে পৌঁছান। তবে জেলার অন্যান্য পর্যটন এলাকায় আরও কয়েকজন পর্যটক আটকে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন থানচি টুরিস্ট গাইড সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ।
তিনি জানান, উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় থানচি ঘাট হয়ে রেমাক্রী ও পদ্মমুখ এলাকায় আটকে থাকা পর্যটকদের উদ্ধারে একটি গাইড দল পাঠানো হয়। নিরাপত্তার জন্য লাইফ জ্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে তারা উদ্ধার অভিযান চালায়। পরে ধাপে ধাপে নৌকাযোগে পর্যটকদের থানচিতে ফিরিয়ে আনা হয়।
থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল আল ফয়সাল জানান, আমিয়াখুম ও নাফাখুমে আটকে থাকা সব পর্যটককে নিরাপদে থানচি সদরে আনা হয়েছে।
জননিরাপত্তার স্বার্থে আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র, ঝরনা, পাহাড়ি পথ, নদীপথ ও দুর্গম এলাকায় ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জেলা প্রশাসন।
সবচেয়ে করুণ ঘটনাটি ঘটেছে সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়িতে। সেখানে পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে ভেসে আলিয়া সোলতানা নামে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
লামা ও আলীকদমে পাহাড়ি ঢল ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আলীকদমের প্রধান সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ফাইতং ইউনিয়নে পাহাড়ধসে একটি বসতবাড়ির অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অতিবৃষ্টির কারণে বান্দরবান জেলা সদরের কালাঘাটা, বালাঘাটা, বনরূপা পাড়া ও সিদ্দিক নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিচু এলাকার অনেক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ায় প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।
ভারী বর্ষণে মাটি নরম হয়ে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের গ্রীনপিক রিসোর্টসংলগ্ন এলাকায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের একটি খুঁটি হেলে পড়ে। এর ফলে বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় টানা ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এতে হাসপাতাল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, খুঁটি হেলে পড়ার পরপরই নিরাপদভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর কাজ শুরু করা হয় এবং প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছে।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার সাতটি উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় সড়কের ওপর মাটি ও পাথর ধসে পড়ায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। তবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় সড়ক সচল রাখতে প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভ্রমণ না করার অনুরোধ জানান।